ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা। এর আগে তিনি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর (২ মে ২০০৫—৩০ এপ্রিল ২০০৯), পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ একাডেমি ফর রুরাল ডেভেলপমেন্টের (বার্ড) মহাপরিচালক। এছাড়া তিনি যেসব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন তার মধ্যে রয়েছে সিরডাপ, এডিবি, এসক্যাপ, এফএও, আইএলও, ইউএনডিপি, ইউনেস্কো ও বিশ্বব্যাংক। সম্প্রতি আসন্ন বাজেটের নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন বণিক বার্তায়। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সাবিদিন ইব্রাহিম
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম বাজেটে কোন বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন? এবারের বাজেট দর্শন কী?
আমাদের লক্ষ্য হলো একটা বাস্তবভিত্তিক বাজেট করা। সীমিত সম্পদ নিয়ে উচ্চাভিলাষী বাজেট প্রণয়ন করব না। বড় কোনো প্রকল্প নেয়া হবে না। মানুষের প্রত্যাশা বাড়াতে চাই না।
এবারের বাজেট দর্শন হলো একটা সমতাভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা। এতদিন আমরা অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির কথা বলে এসেছি, কিন্তু এ প্রবৃদ্ধির সুফল জনগণ ন্যায্যভাবে পায়নি। কল্যাণমুখী রাষ্ট্র হওয়ার পথে আমরা এগোতে পারিনি। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দিতে চাই। তরুণ ও যুবকদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে আমরা মনোযোগ দিতে চাচ্ছি, উন্নয়নশীল দেশে যা খুবই প্রয়োজন। এ প্রেক্ষিত মাথায় রেখে নিজস্ব সম্পদ এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানসহ সার্বিক দিক বিবেচনায় নিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা হবে।
আপনারা একটা সংকোচনমূলক বাজেট দিতে চাচ্ছেন। এর ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে বরাদ্দ কমানোর ঘোষণা এল। অন্যদিকে সরকারি কর্মকর্তাদের মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এটা স্ববিরোধী সিদ্ধান্ত কিনা?
বাজেট বরাদ্দে কিছু ভৌত অবকাঠামোসহ যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এগুলোয় আমরা গুরুত্বারোপ করেছি। আগের বাজেটের মতো মেগা প্রকল্প, যেমন সেতু, মেট্রোরেল, টানেল ফ্লাইওভার এগুলোয় তেমন গুরুত্ব দিচ্ছি না। জিডিপির অনুপাতে শিক্ষা বা স্বাস্থ্যে মোট বরাদ্দ কমছে এটা ঠিক। তবে সম্পদের পরিমাণের তুলনায় বিবেচনা করলে দেখা যাবে বরাদ্দ যথাযথ। বরাদ্দের কারণে এ খাতগুলো ভুগবে এমন নয়। তাছাড়া আসন্ন বাজেটের পরিচালন ব্যয়ের আকার ছোট, বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের আকারও ছোট। অথচ আগের বাজেটে আমরা দেখেছি পরিচালন বাজেটের চেয়ে উন্নয়ন বাজেটকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। যদিও এ বাজেটের অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। অর্থের সদ্বব্যবহার হয়নি। প্রচুর অর্থ ও সময় অপচয় হয়েছে। দুর্নীতি বেড়েছে। যার ফলে ওই বাজেট দিয়ে বর্তমান বাজেটকে বিচার করলে হবে না। আমরা চাচ্ছি একটা অতি উচ্চাভিলাষী বাজেট না করে বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রণয়ন করতে।
আগের বাজেটে অনেক মেগা প্রকল্প নেয়া হয়েছিল, এবার আমরা কেমন মেগা প্রকল্প দেখব?
আগের বাজেটে যেসব মেগা প্রকল্প ছিল পদ্মা সেতু, টানেল, বড় বড় রাস্তা যেগুলোর কাজ এখনো শেষ হয়নি, ৩০ বিলিয়ন ডলারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প এগুলোর মতো বড় প্রকল্প নেব না। আমরা লোক দেখানো কাজ করব না। আমাদের নেয়া প্রকল্পগুলো হবে ১ বিলিয়ন থেকে ২ বিলিয়নের। চেষ্টা করব আর্থসামাজিক কাঠামো ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে এমন প্রকল্প নেয়ার। এছাড়া যেসব প্রকল্পের সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা সম্ভব, সেগুলোয় আমাদের মনোযোগ থাকবে বেশি। সেই সঙ্গে বৈদেশিক সাহায্য নিয়ে কিছু করা থেকে বিরত থাকব। আমরা ঋণ অনুদান নিতে পারি, কিন্তু কোনো প্রকল্পের পুরো ব্যয় বিদেশ থেকে নেয়া হবে না। তাছাড়া আমাদের এডিবির আকারও তুলনামূলক কম থাকবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক এক ত্রৈমাসিক পরিসংখ্যানে দেশে বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ ৩০ হাজারে। আমরা জানি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলোর একটি ছিল কাজের ন্যায্য সুযোগ বাড়ানো। এ বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেটে কী থাকছে?
বেকার জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে আমাদের প্রধান লক্ষ্য ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো। পাশাপাশি বিশেষত বেসরকারি খাতের বিকাশ ঘটলে তাদের আয়ের উৎস তৈরি হবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষা খাতে বিভিন্ন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কিছু পদক্ষেপ নেয়া হবে। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোর মান বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে। বিদেশগামী শ্রমিকদের দক্ষতা আরো বৃদ্ধিতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত খাতে দক্ষতা বাড়ানো ও সেবার মানোন্নয়নে নজর থাকবে। এছাড়া স্থানীয় প্রকল্পগুলোকে স্থানীয়ভাবেই বাস্তবায়ন করা হবে। বিদেশ থেকে ইঞ্জিনিয়ার এনে, বিদেশী অনুদান ও বড় বড় যন্ত্রপাতির মাধ্যমে দেশের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় কিন্তু এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় না। পদ্মা সেতু নির্মাণে দেশের কত লোকবল নিয়োজিত ছিল? নির্মাণকাজে নিয়োজিতদের বেশির ভাগই ছিল বাইরের। পাশাপাশি বৈষম্য দূর করার জন্য কিছু উদ্যোগ থাকবে।
বৈষম্য দূর করতে হলে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো আত্ম-কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। তরুণদের জন্য তাই জরুরি হলো ব্যবসা ও চাকরির সুযোগ। আত্মকর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দরকার অর্থ সংস্থান ও রেগুলেটরি চেইন। আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের সহযোগিতায় অর্থসংস্থানের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছি, যা কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
বিগত সরকারের আমলে অর্থ সংস্থানের বিষয়টি অল্প কিছু লোকের কাছেই ছিল। তারাই খরচ করতেন এবং এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতেন। ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদ সর্বত্র তারাই ছিল নিয়ন্ত্রণকারী। আমরা যখন এ কেন্দ্রীকরণকে ভেঙে দেব, তখন অনেকেই আসবে বিনিয়োগ নিয়ে, তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়বে। গুণগত মান বাড়বে। এর ভেতর দিয়ে কর্মসংস্থানও হবে।
বিবিএস, ব্যানবেইসসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানের মান নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। অনাস্থাও আছে। সঠিক তথ্যের অভাবে সরকারি-বেসরকারি নানা কাজ দীর্ঘায়িত হয়, বাধাগ্রস্তও হয়। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পরিসংখ্যানের মানোন্নয়নে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে?
পরিসংখ্যানের মানোন্নয়নের জন্য আমরা চেষ্টা করছি। এটার বাজেট করতে হলে আমাদের সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে হবে। আমরা জানি রফতানি পরিসংখ্যান নিয়ে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এক ধরনের কথা বলেছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ভিন্ন কথা বলেছে। এটার একটা সমাধান হয়েছে। দিনের পর দিন এটা অসংগতিপূর্ণ ছিল। এছাড়া মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান নিয়েও অসংগতি ছিল।
আগে বিবিএস স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ছিল না। তবে এখানে বর্তমানে একটা কমিটি থাকবে। এ কমিটি এর পরিসংখ্যান যাচাই-বাছাই করবে। এখানে কোনো সচিব বা উপদেষ্টা কেউ থাকবে না। কেউ এতে হস্তক্ষেপ করবে না। দ্বিতীয়ত, আমাদের সার্ভে সিস্টেম আরো উন্নত করা হবে। এজন্যই সার্ভে ও ডাটাগুলো কম্পিউটারের আওতায় নিয়ে আসা হবে পুরোপুরি। তাহলে ডাটাগুলো খুব সহজেই যাচাই-বাছাই ও রক্ষণাবেক্ষণ করা সহজ হবে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তা আমাদের হাতে আসবে।
বর্তমানে দেশীয় বিনিয়োগও কম হচ্ছে। আবার দেশীয় বিনিয়োগ না বাড়াতে পারলে বিদেশী বিনিয়োগও আসবে না বলে শোনা যাচ্ছে। দেশীয় ও বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে এ বাজেটে কী পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে?
দেশীয় বিনিয়োগকারীরা ব্যবসার জন্য ব্যবসার পরিবেশ, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা, নীতি, দেশীয় আইন, সনদ প্রাপ্তির সহজলভ্যতা, ভূমি আইন এসব পর্যালোচনা করে। একইভাবে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও এগুলো দেখে। আমাদের দেশে লাইসেন্স বা অনুমোদন পেতে অনেক জায়গায় যেতে হতো। এগুলো আমরা সহজ করার চেষ্টা করছি। আমদানি-রফতানি কার্যক্রম সহজ করতে আমরা ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো করেছি, যেটা ২০০৮ সালেই করার কথা ছিল। ব্যবসা সহজের জন্য আরেকটি জরুরি বিষয় হলো অর্থের সংস্থান। এক্ষেত্রে পুঁজিবাজার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারত, কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের পুঁজিবাজার এখনো ভালোভাবে দাঁড়াতে পারেনি।
দেশের পুঁজিবাজার এখনো ঠিকমতো দাঁড়াল না কেন? এতে কী কী প্রতিবন্ধকতা আছে?
পুঁজিবাজার বিস্তৃত না হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাব। অতীতে শেয়ার মার্কেট ধস ও অনিয়মে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভীতি জন্মেছে। ফলে অপেশাদার বিনিয়োগকারী ও গুজবনির্ভর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মানসম্পন্ন কোম্পানির অভাব এবং নতুন ও উদ্ভাবনী কোম্পানির অনুপস্থিতির কারণেও আমাদের পুঁজিবাজারের সেভাবে বিকাশ ঘটেনি। এছাড়া তথ্য ও স্বচ্ছতার ঘাটতি, ব্যাংক খাতের সংকট ও উচ্চ সুদের হারও এতে প্রভাব ফেলেছে। এ সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া পুঁজিবাজার স্থিতিশীলভাবে দাঁড়াবে না। এজন্য আমাদের মূল কাজ হলো নতুন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) আনা। বড় কোম্পানিগুলোকে বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ দেয়া এবং সার্বিক শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা।
আমাদের করজাল বিস্তৃত হয়নি, কর আহরণও বাড়েনি। সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) বিলুপ্ত করে দুটি বিভাগ করা হলো। এতে কি কর-জিডিপির অনুপাতে কোনো প্রভাব পড়বে?
আমি মনে করি এনবিআর বিলুপ্তির ফলে রাজস্ব আহরণে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। নতুন কাঠামোয় রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা পৃথক করা হয়েছে, যা দক্ষতা বাড়াবে এবং স্বার্থের সংঘাত কমাবে। রাজস্ব আহরণ গত বছরের তুলনায় ২ শতাংশ বেশি হয়েছে, যা ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে।
নতুন কাঠামোয় কর আহরণ প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে। ফলে করদাতাদের জন্য জটিলতা কমবে এবং কর পরিশোধের হার বাড়বে। এ পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, কারণ রাজস্ব আহরণ বাড়লে উন্নয়ন প্রকল্পে বিনিয়োগের সুযোগও বাড়বে। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর ব্যবস্থাপনার ডিজিটালাইজেশন। লাখ লাখ করদাতা যদি হাতে হাতে কর দেন, তাতে বহু সমস্যা তৈরি হতে পারে। কিন্তু তারা অনলাইনে কর দিলে উৎসাহের সঙ্গে দিতে পারবেন বলে বিশ্বাস রয়েছে।
তবে নতুন কাঠামো কার্যকর করতে প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন প্রয়োজন। যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। আমি মনে করি, এনবিআরের এ নতুন কাঠামো দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
আমরা দেখি বাজেটের ৮০ শতাংশ কাজে লাগে বাকি অংশ নানাভাবে অপচয় হয়। এবার কি আমরা আশা করতে পারি বাজেট শতভাগ কাজে লাগবে?
আমি বিশ্বাস করি, এবারের বাজেট বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমূলক হবে। বাজেটের প্রতিটি অংশ জনগণের জন্য কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে কার্যকর প্রকল্পে বিনিয়োগ করাই মূল লক্ষ্য। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে বাজেটের সর্বোচ্চ ব্যবহার সম্ভব হবে।